Wednesday, August 25, 2021

অতৃপ্তি (পর্ব ৯)

 গরম তেলে পাঁচফোড়ন ঢেলে দেয়ার শব্দ। চড় চড় চড় চড় চড়। ডাল রান্নার শেষ পর্যায়ে তেলানি দেয়ার সময় এই বিশেষ ব্যবস্থা চলে। পিঁয়াজ-রসুন তেলে ভাজতে ভাজতে যখন হালকা লাল হয়ে আসে তখন পিঁয়াজ-রসুনের সাথে গরম তেলে মুঠো করে পাঁচফোড়ন ছিটিয়ে দিতে হয়। ফড় ফড় শব্দে পুড়তে থাকে এই দ্রব্যটি। পোড়ার সময় বেশ সুগন্ধও ছড়ায়। পাঁচফোড়ন পুড়তে পুড়তে রসুন-পিঁয়াজ বাদামী রঙ হয়ে আসলে ডাল ঢেলে দিতে হয়। গরম তেলে ডাল ঢেলে দেওয়া মাত্র ফস করে একটা শব্দ হয়। এসময় ডাল, তেলে ভাজা রসুন-পিঁয়াজ আর পাঁচফোড়ন মিলে বাতাসে একটা গন্ধ তরঙ্গ ছড়ায়। রাস্তার পাশে বাড়ি হলে রাস্তার মানুষও টের পায়, ডাল রান্না হচ্ছে। পাঁচফোড়নের এই গন্ধের মত ডালের স্বাদটাও চরম লাগে। ঠাণ্ডা  হয়ে আসলে ডালের উপরে ভাজা রসুন-পিঁয়াজ সহ পাঁচফোড়ন মিশ্রিত একটা স্তর পড়ে। তেলতেলে লাগে। এই স্তরের টেস্টটা ভালো। তবে পাঁচফোড়নের কালিজিরা দাঁতের নিচে পড়লে তিতা লাগে। পাঁচফোড়নের মধ্যে আর কী কী উপাদান থাকে আমি জানি না। শুধু তিতা লাগে যেটা- সেটা কালিজিরা, তা জানি। বাকিগুলোর মধ্যে জিরা বাদে আর সবাই অপিরিচিত।

আমার মা অবশ্য পাঁচফোড়নকে বারোসাজ বলে। এই জিনিষের মধ্যে বারো রকম উপাদান থাকে। তাই এ বিশেষ নাম। মায়ের মতে, সবগুলা উপাদান যদি সঠিকভাবে বারোসাজায় থাকে আর তা দিয়ে যদি ডাল রান্না করা হয়, তো সেই ডালে চুমুক দিলে এক চুমুকে কেয়ামত চলে আসবে। তবে বারোসাজ দেয়া ডালে লবন পানি হলুদ সহ হিসেব করলেও বারো উপাদান পুরবে কিনা কে জানে? হয়তো বারোসাজ এখন আপডেট হয়ে তা বারো উপাদান থেকে পাঁচ উপাদানে পরিণত হয়েছে। পাঁচফোড়ন নাম নিয়েছে। শুধু ডালে চুমুক লাগিয়ে যদি কেয়ামত চলে আসে তো দুনিয়ার আর সব খাবারের কী হবে? ডালের টেস্টের পাশাপাশি আর সব খাবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বারোসাজকে পাঁচফোড়নে আপডেটের প্রয়োজন আছে।

আজ ১৩ই মার্চ। শীতকাল শেষ। বসন্তের মাঝামাঝি সময়। আমি ইয়াকুবের বাড়িতে। বারান্দায় কাঠের পিঁড়িতে চেপে বসে আছি। পিঁড়িটা সাইজে ছোট, উচ্চতায় কম। বারান্দাও নিচু। এক ফিটের কিছু বেশি হবে। অস্বস্তি লাগছে। বারান্দার উচ্চতার জন্য নয়। পিঁড়ির উচ্চতার জন্য। মনে হচ্ছে, পিঁড়ি বাদে এমনিতেই পায়ে ভর দিয়ে দুই হাঁটুর উপর দুই বাহু রেখে হাত সটান করে দিয়ে বসলেও আরাম লাগবে।

আমি একটু আগে উঁচু পিঁড়িতে বসে ছিলাম। ইয়াকুবের মামি (একরামুল স্যারের বউ) নিচু পিঁড়িতে বসতে পারেন না। তিনি আমার থেকে কায়দা করে উঁচুটা চেয়ে নিলেন। রান্নায় সমস্যা হচ্ছে।

অজানা কারনে মামির গায়ে বেশ মেদ জমেছে। ওজনে একটু ভারী হয়েছেন। এটা-সেটা কড়াইয়ে তুলে দেয়া, টাইম মত কড়াইয়ের ঢাকনা খুলে নাড়াচাড়া করা, চুলায় খড়ি ঠেলে দেয়া- ইত্যাদিতে তাকে ঠেস দেয়া পিঁড়ি ছেড়ে পায়ে ভর দিয়ে বারবার উপুড় হতে হচ্ছে। গরমে তিনি বেশ ঘেমেও গেছেন। শহরে মামির কারেন্টের চুলা আছে। গ্যাসের সিলিন্ডার আছে। ফ্রীজ আছে। একবেলা রান্না করে তা ফ্রীজে রেখে বাসি করে সাতবেলা খান। তাকে বেশীরভাগ দিন বীথী বা বীথীর মা রেধে দেয়। রান্না নিয়ে এত আয়োজন, চুলায় সারাদিন ফুঁয়ানোর টাইম- মামির নাই। তার শরীর ম্যাজম্যাজ করলে জাজিম পাড়া খাটে শুয়ে রিমোর্ট হাতে তিনি বত্রিশ ইঞ্চি রঙ্গিন টিভিতে চ্যানেল পাল্টান। বিবিসি-সিএনএন চ্যানেলে ইংরেজিতে খবর দেখেন। স্টার প্লাসে হিন্দি ভাষায় সিরিয়াল, পেন্ড্রাইভে করে এনে কোরিয়ান ড্রামা, ইংলিশ মুভি- এসব দেখেন। ইয়াকুবদের বাড়িতে খড়ি ঠেলা চুলায় মামির রান্নার অভ্যাস নেই একদম। একটুতেই এসব রান্নাঘর ধোঁয়ায় ভর্তি হয়ে যায়। এখানে বিরক্তির শেষ নেই তার।

মামি রান্না ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে আমার পিঁড়ি খেয়াল করলেন। কাম নাই, কাজ নাই- অথচ তারটার থেকে উঁচু পিঁড়িতে আমি বসে আছি। মামি আমার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বললেন, ইয়াকুব কই গেল? ছেলেটাকে একটা উঁচু পিঁড়ি দিতে বলতাম।

ভদ্রতা করে আমি নিজেই মামিকে পিঁড়িটা দিয়ে আসলাম। যখন দিতে গেলাম দেখি উনি উঁচু পিঁড়িটা নিয়ে তার উপর নিচুটা দিয়ে আরেকটু উঁচু হবার চেষ্টা করলেন। আমিও কায়দা করতে ছাড়লাম না। বললাম- মামি, ঐ পিঁড়িটা দেন- নিচে কাঠ লাগিয়ে আরেকটু উঁচু করে আনি। মামি আমার কথায় বেশ খুশি হলেন। তরকারি নাড়া অবস্থায় চামচ হাতে হলকা উঁচু হয়ে বললেন, টেনে নাও। আমি টেনে নিয়ে এসে বারান্দায় একটু সরে বসেছি। যেন দেখতে না পায়, আমি কী করছি।

ইয়াকুবের বাড়িতে মানুষ বলতে ওর মা একলা। বাড়িতে বসার জিনিষ- এই পিঁড়ি দুটো। ইয়াকুবের একলা মায়ের জন্য দুটো পিঁড়ি অনেক।

বারান্দার আরেক পাশে গরুর একটা চাড়ি সাজানো। শুকনো হয়ে আছে। এই চাড়িতে গরু ছিল প্রায় বছর তিনেক আগে। গরুটা ইয়াকুবকে ভার্সিটি ভর্তি করানোর সময় বেচে দেয়া হয়েছিল। গরুটা নিয়ে ইয়াকুবের অনেক স্মৃতি। আমাকে কয়েকবার শুনিয়েছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মন খারাপ লাগলে আমাকে গরুটার গল্প শোনায়। মাথায় হাত বুলালে গরুটা থেমে যেত। গলা চুলকে দিলে ঘাড় সোজা করে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে যেত। একহাত মাথায় রেখে আরেকহাত দিয়ে গলা চুলকে দিলে চোখ বেয়ে পানি পড়তো। ইয়াকুব ছাড়া অন্য কেউ খাবার দিলে খেত না। ইয়াকুবের মা দিলেও না। গরুটার দেখ-ভালের জন্য ইয়াকুবের রুটিন করা ছিল। লাল কালিতে কাগজে লিখে ঘরের দেয়ালে বেশ উঁচুতে টানিয়ে রেখেছিল ইয়াকুব। রুটিনটা এখনো আছে। কালিটা শুধু হালকা হয়ে গেছে। আমি ঘরে ঢোকার পর খেয়াল করেছি।

ডেইলি রুটিন ফর মাই বয় (যদিও গরুটা বকনা)

সকাল ৬টাঃ গোয়ালঘর থেকে গরু বের করা (দুইটাই)।

সকাল ৬.০০-৬.১০টাঃ মাথায় হাত বুলানো+গলা চুলকে দেয়া (শুধু আমারটার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।

সকাল ৬.৩০-৬.৪০টাঃ গোয়ালঘর পরিষ্কার করা (শুধু আমারটার অংশ)।

সকাল ৬.৪০-৭.০০টাঃ গোসল করানো (শুধু আমারটাকে)।

সকাল ৭.০০-৭.৩০টাঃ তাজা ঘাস কেটে আনা (দুইটার জন্যই)।

সকাল ৭.৩০-৭.৪৫টাঃ ঘাসের পানি ঝরিয়ে কুচি করা (দুইটার জন্য)।

সকাল ৮.০০টাঃ ঘাস খেতে দেয়া (দুইটাকে)।

সকাল ৮.১৫টাঃ পানি আর খৈল সহ দুই চাড়ি ভরে দেয়া।

সকাল ৮.২০-৮.৩০টাঃ নিজে গোসল করে স্কুলের জন্য রেডি হওয়া। ভাত খেয়ে মাই বয় থেকে বিদায় নেয়া।

মিস্টার ইয়াকুব

ক্লাস সেভেন

রোল নং- ৭।

 

ইয়াকুবের রোল নম্বরের ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি। ক্লাস সেভেনে রোল নম্বর সাত। হাইফাই ভালো ছাত্র ছিলো না ইয়াকুব। গ্রামের স্কুলে পড়ে সাত রোল অনেক পিছে। শহরের স্কুল হলে রোল নম্বর কোন ব্যাপার নয়। সবাই ভাল ছাত্র। আমি ইয়াকুবকে তার স্কুল জীবনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, আরে মামু বলিস না। ছোট বেলায় মা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করে দিল, সবার আগে আমি ভর্তি হইছিলাম তাই রোল হল ১। তারপর ক্লাশ টু তে গিয়ে ২। থ্রিতে ৩। ফোরে ৪। ফাইভে ৫। সিক্সে হলো ৬। এই ঘটনা যে ধারাবাহিকভাবে ঘটছে তা প্রথম বুঝতে পারলাম ক্লাস সিক্সে। ভাবলাম, বাহ ভালোইতো! প্রতি ক্লাশে এক এক করে রোল বাড়ছে। টাকা পয়সা বাড়লে মানুষ যেমন খুশি হয় আমি তার চেয়েও খুশি হলাম আমার রোল নম্বর বাড়া দেখে। স্যারকে বললাম- স্যার, আমার রোল নম্বর তো প্রতি বছর এক এক করে বাড়ছে। আমি কিভাবে আরো ভাল করতে পারি? স্যার আমাকে বললেন, আমি যত বেশি পড়ব আর পরীক্ষায় ভালো করব আমার রোল নম্বর তত বেশি কমবে। তারপর আমি পড়ালেখায় ঢিল দিলাম। আমার গরুর দিকে মনযোগ বাড়ালাম। ক্লাস সেভেনে হলাম সেভেন। এটাও একটা ভাগ্য বলতে পারিস। ক্লাস সিক্সে কোথা থেকে এক মেয়ে এসে ভর্তি হয়ে ক্লাস সেভেনে ফার্স্ট হয়ে গেল। যার রোল ৫ ছিল সে গেল আটে। নবম আসলো ছয়ে। আর আমি হলাম সেভেন। তার মানে মেয়েটা না আসলে আমার রেকর্ডটা ভেঙ্গে যেত।

রেকর্ড ভেঙ্গে যেত মানে?

মানে, আমি ক্লাস সেভেনেও ঘুরে ফিরে ষষ্ঠই হতাম।

তার মানে তোর রোল নম্বর ক্লাস এইটে আট, নাইনে নয় আর টেনে দশ?

ইয়েস।

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে হারামির রোল নম্বর যে কত ছিল সেটা আর জিজ্ঞাসা করলাম না। ওইটা আর এগারো-বারো হবার সম্ভাবনা নাই। আমি শিওর।

আর কলেজে ভর্তি হলাম রোল নম্বর হলো এগার। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা দিলাম। বারোতম হলাম।

তোর ইউনিভার্সিটিতে রোল নম্বর কত?

১৩।

 

ইয়াকুবের ভাষায়- গরুটা বিক্রির আগ পর্যন্ত তার এই রুটিনের তারতম্য হয়নি কখনো। ইচ্ছা ছিল গরুটা কোনদিন বিক্রি করবে না। সে তার জন্মদিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইয়াকুবের সাথে কাটাবে।

সে সময় ইয়াকুবের বাবা বেঁচে ছিলেন। অন্য গরুটার দেখ-ভাল তিনি করতেন। বাকিটার দেখ-ভাল করতেও তার কোন আপত্তি ছিল না। তবে ইয়াকুব নিজ থেকে বাছুরটার দায়িত্ব নেয়। তার বাপ ঠিকমত গোসল করান না। ঘাস কুচির সময় সাইজ বড় করেন। বাছুর গরুর বড় ঘাস খেতে সমস্যা হয়। ঠিকমত পানি দেন না। যত্ন করেন না। এরকম সব অভিযোগ তার বাবার প্রতি।

বারান্দায় আমি যে পাশে বসে আছি সে পাশটায় একটা রুগ্ন গরু দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ইয়াকুবেরটার মাম্মিজান। আমার দিকে চেয়ে আছে। এর দৃষ্টিটা পড়তে পারছি না। কোন নবী যেন পশুপাখির ভাষা বুঝতেন। হযরত সোলাইমান (আঃ)। আমি যদি বুঝতে পারতাম, গরুটা আমাকে বলছে- ঐ, তৃষ্ণা পাইছে পানি দে। আমি পানি এনে দিতাম। ঐ, ঘুরতে যাবো দড়িটা খুলে দে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বাঁধনটা একটানে খুলে দিতাম। এই গরুটা রুগ্ন-শুকনো। সর্বশেষ বাছুরটা জন্মের সময় মারা গেছে। তখন ইয়াকুব বাড়িতে ছিল না। সে বাছুরটাকে দেখেনি। বেশ আফসোস করেছে সে জন্য। বাছুর দেখতে না পেয়ে ইয়াকুবের আফসোসের কারন কী- আমি জানি না।

রুগ্ন এই গরুটা প্রতিদিন আড়াই লিটার দুধ দেয়। হাফ লিটার দুধের দাম গরুর পেছনে খরচ হয়। এক লিটারের দাম ইয়াকুবের জন্য বরাদ্দ। আর ৫০০মিলির দাম ইয়াকুবের মায়ের জন্য। বাকি ২৫০মিলি ইয়াকুবের মা জাল দিয়ে নিজেই খান। সর তুলে ঘি বানিয়ে ইয়াকুবের জন্য জমান। ইয়াকুব বাড়ি আসলে খায়। কিছু থাকলে সাথে করে নিয়ে যায়।

ইয়াকুবের গ্রামে প্রতি লিটার দুধের খুচরা দাম ২৫ টাকা। এক গোয়ালা নিয়মিত বাড়ি এসে গাই দুইয়ে দুধ নেয়। তাই ২০ টাকা লিটার দরে দুই লিটার ২৫০ মিলি দুধের দাম রাউন্ড ফিগারে ৪০ টাকা দেয়। মাঝেমাঝে দুধ একটু-আধটু কম হলেও গোলায়া পুরো ৪০ টাকাই দেয়। ভার্সিটি পড়ুয়া একটা ছেলে আছে বলে এটুকু সম্মানি পান ইয়াকুবের মা।

এই হিসেবে মাস শেষে ইয়াকুবের বাড়ি থেকে পাওয়ার কথা ৬০০ টাকা। কিন্তু কোনমাসে ইয়াকুবের মা ৫০০ টাকার উপরে পাঠাতে পারেন না। নিয়মিত গরুর দুধ হয় না। দুধ থেকে মাসে ইয়াকুবের জন্য ৩৫০-৪০০ টাকা বরাদ্দ হয়। হাঁস মুরগির ডিম বেচেও কিছু টাকা জমান ইয়াকুবের মা। সব মিলিয়ে মাস শেষে পাঁচশ টাকার একটা নোট বানাতে পারলেই মায়ের মুক্তি।

তার মায়ের ধারণা বিদেশ থাকলে ছেলেদের এক নোট আর মেয়েদের দুই নোট লাগে। তার যেহেতু ছেলে বিদেশ থাকে তাই সারামাস ধরে তিনি এক নোট জোগাড়ে ব্যস্ত থাকেন। চকচকে বা ময়লা। টাকার গায়ে ময়লায় কোন সমস্যা নেই, ইয়াকুবের মা জানে। ময়লায় যত সমস্যা যুবতী মেয়েদের গায়ে। বিয়ে দিতে গেলে টের পাওয়া যায়। তবে ছেড়া টাকা যে টেপ লাগিয়ে চালানো যায় এইটা জানেন না তিনি। পঞ্চাশ টাকাকে 'আদশো ট্যাকা', পাঁচশত টাকাকে 'আদ হাজার ট্যাকা' নামে ডাকেন এই ভদ্র মহিলা। আমার দিকে তাকিয়ে থাকা এই রুগ্ন গরুর দুধ, হাঁস-মুরগীর ডিম এক নোটের এই 'আদ হাজার ট্যাকা'র জোগানদাতা।

গত ধানের সিজনে ইয়াকুবের মায়ের ৫টা মুরগী বিষ খেয়ে মরেছে। কার জমিতে বিষ মাখিয়ে ধান বুনেছিল। মুরগীরা আনন্দ করে খেয়ে নেচে-গেয়ে বাড়ি ফিরেছে। সন্ধ্যায় ইয়াকুবের মা তাজা-তাজা মুরগী কোঁঠায় তুলেছেন। সকালে ডিম আনতে গিয়ে কোঁঠা খুলে দেখেন সব কয়টা মরে পড়ে আছে। পাশের বাড়ির নাকি পনেরো জোড়া কবুতর মরেছে একসাথে। সাথে তাদের ১১ জোড়া বাচ্চাকাচ্চা। বাপ মা বিষ খেয়ে এসে সেই খাবার বাচ্চাদের আদর করে মুখে তুলে খাইয়েছে। সব গুস্টিসুদ্ধ মরেছে।

ইয়াকুবের বাড়িতে মোট তিনটা ঘর। দুইটা শোবার ঘর। একটা ইয়াকুবের বাবা-মায়ের। আরেকটা ইয়াকুবের। আর অন্যটা হল গোয়ালঘর। গোয়ালঘরে পার্টিশন করে রান্নাঘর বানানো। রান্নাঘরের যে পাশে গরু থাকে সে পাশে শুকনো খড়ি চাপিয়ে রাখা হয়েছে। খড়ির বিপরীত পাশে রান্নার চুলা পাতানো। পূর্ব-পশ্চিম করে।

প্রতিটা ঘরের বারান্দার ছাউনি খড়ের। চাল টিনের। আর দেয়াল বন ঘাসের। গোবর মাটি দিয়ে লেপে দেয়া। দেয়ালের মাটিতে হালকা চিড় ধরেছে। তবে চকচকে। শোবার ঘরের খুঁটিগুলো বাঁশের হলেও গোয়ালঘরেরগুলো সিমেন্টের। বেশ মজবুত। মেঝে খরখরে। মনে হলো ইট পাড়া। বহুদিনের পুরনো ইট।

ইয়কুবের বাড়ি রাস্তার ধারে নয়। গ্রামের মেইন রাস্তা থেকে একটা পুকুর পার হয়ে বাঁশের ঝাড়। তার পাশ দিয়ে প্রায় ২০০মিটারের মত হেটে ডানে মোড় নিলে একটি পুকুর। এই পুকুর থেকে এক বিঘা ফসলী জমি পার হলে ইয়াকুবের বাড়ি। এই বাড়িতে আসার নিজস্ব কোন রাস্তা নেই। অন্য সব জমির আইল বেয়ে বাড়ি আসতে হয়। ইয়াকুবের বাবা গরীব মানুষ জন্য তাদের কেউ কিছু বলে না। বরং তাদের চলাচলের সুবিধার জন্য জমিগুলোর আইল একটু প্রশস্ত করে রেখেছে। আসার সময় সেটা খেয়াল করেছি। আশেপাশের আইলগুলো থেকে ইয়াকুবের বাড়ি আসার আইলগুলো একটু চওড়া।   

একরামুল স্যার বাড়িতে ঢুকলেন। স্যারের পিছে ইয়াকুব দাঁড়িয়ে। বাজারের ব্যাগ হাতে। ইয়াকুবের বাম হাতে বেশ বড় সাইজের একটা কাতল মাছ। দেড় কেজির উপরে ওজন হবে। খেজুরের পাতা কানকো দিয়ে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করে শক্ত করে বাঁধা। এই গিট ইয়াকুবের দেবার সাধ্য নাই। মাছ বিক্রেতা বেঁধে দিয়েছে নিশ্চয়।

চলবে...

অতৃপ্তি (পর্ব ৮)

 সকাল ছয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিট। মাতালের মত সারারাত ঘুমিয়েছি। রাতে তিন বার ঘুম ভাংছে। আতংকে। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় নাকি সে ভয়ে। এই বুঝি পুলিশ এলো। দরজা ধাক্কাচ্ছে। হুড়মুড় করে উঠে দেখি কেউ নেই।

পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়া নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে। হলে উঠার আগে যখন মেসে ছিলাম তখন এক ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। নাম- সালাম। আব্দুস সালাম। এই লোক বলতো সে জীবনে কখনো হলে উঠবে না। কারণ, পুলিশ হল থেকে নিরাপরাধ ছাত্রদের দলবেধে ধরে নিয়ে যায়। একবার মাদার বক্স হলে নাকি এরকম পুলিশি অভিযান হয়েছিল। একটা ব্লক থেকে দশ পনেরো জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছিল। এক বোকাসোকা ছেলে আবার বুদ্ধি করে টয়লেটে লুকিয়ে ছিল। পরে যখন ভেতর থেকে বুঝতে পেরেছে আর আশেপাশে পুলিশ নেই তখন বের হয়ে চিল্লায়ে উঠেছে।

‘ইয়া হু! সবাইকে ধরেছে, আমাকে ধরে নাই’।

আসলে পুলিশ তখনো যায়নি। সে পেছনে খেয়াল না করেই চিল্লানি দিছে। চিল্লানির পর সামনের বাকি ছেলেগুলোর পজিটিভ রেসপনজ না পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে পুলিশের দল দাঁড়িয়ে আছে। অফিসার তার আনন্দ দেখে কড়া চোখে হাবিলদারকে বললেন, এরেও গাড়িতে ওঠা।

আমাদের হলে রাতে অবশ্য পুলিশ এসেছিল। যে পুলিশটার সাথে কথা বললাম তাকে বেশ মার্জিত মনে হলো। কাউকে ধরেছে কিনা জানি না। রাতে দরজা ধাক্কাচ্ছিল। খুলে দিলাম।

ভাই আইডি কার্ডটা দেখি?

আমি বললাম- আরে ভাই, আবাসিক না হলে, হলে আছি কেন? আইডি কার্ড না থাকলে তো হলেই তুলবে না। 

বুঝলাম ভাই। তাও দেখান। উপরের নির্দেশ।

ইয়াকুব ঘুমের ভান ধরে উপর হয়ে শুয়ে আছে। পুলিশ দেখে ভয় পেয়েছে। ও আবার আন্দলনে স্লোগান দিয়েছিল। সেই ভয়ে হয়তো উঠছে না। ধরে নিয়ে যেতে পারে।

পুলিশ ভাইকে আমার আইডি কার্ড দেখালাম। পুলিশ ভাই বলল, ওই ভাইয়েরটাও দেখান। আমি ইয়াকুবের মানিব্যাগ থেকে ওর আইডি কার্ড বের করে দেখালাম।

পুলিশ সাহেব আইডি হাতে নিয়ে বললেন, শোনেন ভাই, এত রাতে মানুষের ঘুম ভাঙ্গানোর ইচ্ছা আমাদের নাই। আমাদেরও বউ আছে। সংসার আছে। একটু ঘুমাতে ইচ্ছা করে তাদের সাথে। কিন্তু এমন একটা চাকরি করি, দিন নাই রাত নাই, কারণে অকারণে ছুটে বেড়ানো। আর কথায় কথায় বলা, উপরের নির্দেশ। কিছু মনে করবেন না ভাই, ডিস্টার্ব করলাম। এটুকু করতে আমি বাধ্য।

ইয়াকুবের আইডি কার্ডটা হাতে দিয়ে পুলিশ ভাই চলে গেল পাশের রুমে। ধমাধম দরজায় লাথি মারছে। লাথি মারার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে পুলিশ ভাইয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, আদুরে স্বরে দরজা ধাক্কালে এইসব চেংড়া ছেলেদের রাত আড়াইটার ঘুম ভাঙ্গাতে সকাল আটটা বাজবে শিওর।

এখন সকাল সাতটা পাঁচ মিনিট। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ গুছাচ্ছি। ইয়াকুব ৬টা তিরিশে বাস ধরে বাড়ি গেছে। ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। কবে যে খুলবে তার কোন দিশা নেই। অনেক কিছু ব্যাগে ভরেছি। এখন বেশ ভারী আর পেটমোটা একটা ট্রাভেল ব্যাগের মালিক আমি। এত জিনিসপত্র আমার! অবাক লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন থেকে ট্রেনের সঠিক সময় ৮.১৫মিনিট। এই ট্রেন আসে ৮.৪৫মিনিটে। আজ ৯ টা পার করবে।

শাহ মখদুম হল থেকে বের হয়ে সোজা স্টেশনের পথে হাটছি। পথিমধ্যে জোহা স্যারের সাথে দেখা হয়ে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম, স্ফুলিঙ্গের সামনে। স্যার আমার দিকে ঘাড় কাত করে বেশ লজ্জিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। আমি শ্রদ্ধাভরে স্যারকে সালাম দিলাম। সালামের কোন জবাব পেলাম না। স্যার বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন। আমার থেকে চোখ সরাচ্ছেন না। আমিতো রাত জেগে চোখের নিচে কালি মাখানো, ঘর্মাক্ত-দূর্গন্ধযুক্ত টিশার্ট পরিহিত এক সাধারণ ছাত্র। যার বুক বুলেটে ঝাঁঝরা হলে ‘মেধাবি ছাত্র’ উপাধিতে বন্ধুদের চাঁদা তুলে বানানো নিম্ন মানের দুই একটা টানানো ব্যানারে কয়দিন অস্পষ্ট ছবি হয়ে শূন্যে ঝুলে থাকবো মাত্র। আমাকে দেখে স্যারের লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ নেই। এটা শিল্পীর ভুল নিশ্চয়।

স্টেশনে ট্রেনের জন্য বসে আছি। এক পিচ্চি পত্রিকা বিক্রি করছে। দশ টাকা দিয়ে একটা পত্রিকা নিলাম। সমকাল। বিশ পাতার কাগজের সঙ্গে ষোল পাতার ম্যাগাজিন। পাঁচআল। শিরোনামে বড় অক্ষরে লিখা- ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণা- পুলিশের লাঠিপেটা’। বিস্তারিত ৮নং পাতায়।

সেদিন খাওয়া শেষে চলে আসার সময় ইয়াকুব একটা গান শুনিয়েছিল। সে বলল, একটা গান মাথায় আসছে। থাম, সুর করে গেয়ে শোনাই।

বেশ দরদ ভরা কন্ঠে ইয়াকুব গানটা গেয়ে শোনালো। গানের কথাগুলো আমার ভালোই লাগল। বীথীরও ভালো লাগলো। গান গাওয়ার টাইমে বীথী ইয়াকুব ছাড়া অন্য কোন দিকে নজর ফেরায়নি।

পরে রুমে এসে দেখি হারামী গানটা বহুত আগে লিখে রেখেছে। আমি পড়ে মুখস্ত করে নিয়েছি। ইয়াকুবের দেয়া সুরে বসে বসে গানটা গাইছি।

শিশিরে রয়েছো তুমি

সূর্যালোকে হেসে কূল,

চিনিনি তোমাকে আমি

কেন হলো এমন ভুল?

 

তুমি তো সে হেসে বেড়াও

থেমে থাকা পটোফুলে,

চিকিমিকি জ্বলে তা যে

চান্দের ই আভাস পেলে।

 

খুঁজি যে তোমাকে আমি

ঝরণার ই কোলাহলে,

বয়ে চলে উষ্ণতা তার

পাহাড় হতে নদীর ঢলে।

 

তোমায় আমি খুঁজি যেথায়

ভ্রমর উড়ে হারায় কূল,

ঐ যে দেখো ফুটেছে কত

বাগান ভরে ঘাসফুল।

 

আমি যে তোমাকে খুঁজি

চাহিয়া আকাশেতে,

কত শত তারা দেখো

জুড়ে আছে তারি বুকে।

 

শিশিরে রয়েছো তুমি

সূর্যালোকে হেসে কূল,

চিনিনি তোমাকে আমি

কেন হলো এমন ভুল?

হু হু হু হু হু হু হু

হু হু হু হু হু হু হু

 

চিনিনি তোমাকে কেন?

আরো আরো আরো আগে...

এত কাছে ছিলে তুমি...

হু হু হু হু হু হু হু হু

 

চিনিনি তোমাকে আমি,

কেন হলো এমন ভুল?

এত কাছে ছিলে তুমি...

লা লা লা লা লা লা লা

৯.১৩ মিনিট। ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে। আমার হাতে রাজ্যের ভারি ব্যাগ।

চলবে...

অতৃপ্তি (পর্ব ৭)

 ফেব্রুয়ারির শুরু। বেলা দশটা পঁয়ত্রিশ মিনিট। মিটিমিটি রোদ। তেমন শীত নেই। একটা শার্ট গায়ে দিয়ে থাকার মত পরিবেশ। সোয়েটার পরার প্রয়োজন নেই।

আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একা নই। কয়েক হাজার সাধারণ শিক্ষার্থীর সাথে। প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে বেশ দামি দামি কয়টা চায়না তালা ঝুলছে। শিক্ষার্থীরা এই তালাগুলো ঝুলিয়ে দিয়েছে। কংক্রিটে খোদাই করে লেখা ‘প্রশাসনিক ভবন’ তার উপরে দুই কর্ণারে দুই দিক করে দুইটি মাইক লাগানো। নিচে একপাশে একটা ভাড়া করা অর্ধভাঙ্গা রিক্সায় মাইকের মেশিনপত্র। কংক্রিটের ছাদের নিচ থেকে মাইকে স্লোগান দেয়া হচ্ছে-

‘প্রশাসনের কালো হাত, ভেঙ্গে দাও-গুঁড়িয়ে দাও।’

‘শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, চলবে না-চলবে না।’

‘একপক্ষীয় শিক্ষা, মানি না-মানবো না।’

‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো।’

-এরকম টাইপ সব স্লোগান।

ভবনের ভেতরে কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। বাইরে আসার জন্য ছুটোছুটি করছে। তালা দেবার আগে ভেতরে ঢুকেছিল। আটকা পড়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা এসেছেন। টিভিতে লাইভ খবর প্রচার করছেন। ভালো একটা পজিশন নিয়ে কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের সারি করে সাংবাদিক ভাইয়েরা সামনে দাঁড়িয়ে খবর প্রচার করছেন। সামনে ক্যামেরা ম্যানরা এদিক ওদিক ক্যামেরা ঘুরিয়ে ভিডিওচিত্র ধারণ করছেন। আমিও এরকম এক সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। এই সাংবাদিক ভাই কোন টিভি চ্যানেলের বুঝলাম না। বুঝার জন্য কাউকে জিজ্ঞাসাও করলাম না। কেউ হয়তো বলতে পারতো। খবর যে টিভিতে লাইভ প্রচার হচ্ছে তা শুনেই খুশি। পাশের একজন কাকে যেন ফোন করে বলল, তেত্রিশ নম্বর চ্যানেলে লাইভ খবর দেখাচ্ছে। দেখতো, আমাকে দেখা যাচ্ছে কিনা? তেত্রিশ নম্বর হয়তো ওই এলাকার ডিশ সংযোগের চ্যানেল নম্বর। এ নামে কোন টিভি চ্যানেল থাকার কথা নয়। সাংবাদিক ভাই মাইক্রোফোনে বেশ জোরে কথা বলছেন।

‘আমি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে প্যারিস রোড সংলগ্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পেছনে দেখছেন আন্দোলনরত কয়েক হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী। আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি এখানে দল মত নির্বিশেষে সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রাণের দাবি নিয়ে আন্দোলনে স্লোগান দিচ্ছে। আমি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখেছি কোন একাডেমিক ভবন খোলা নেই। সব ভবনের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীরা তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন, প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটক তালা ঝুলিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ছেলেমেয়েরা স্লোগান দিচ্ছে’।

কিছুক্ষণ থেমে সাংবাদিক ভাই আবার শুরু করলেন।

‘আপনি দেখছেন, আশে-পাশে আইন শৃংখলা বাহিনীর কোন উপস্থিতি নেই। তাদের ছাড়াই শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দলোন চালিয়ে যাচ্ছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন, মাঝখানে ছাত্রীরা গোল হয়ে বসে আন্দোলনে স্লোগান দিচ্ছে, স্লোগানে গলা মেলাচ্ছে। আর ছাত্ররা তাদের ঘিরে গোল হয়ে আছে আর মূল স্লোগানের সাথে গলা মেলাচ্ছে। সকাল থেকে অনাকংখিত কোন ঘটনা এখনো ঘটেনি। সবমিলিয়ে দারুণ শান্তিপূর্র্ণ একটি আন্দোলন চলছে’।

‘হ্যাঁ সোমা’।

সাংবাদিক ভাই লাইনের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে মাইক্রোফোনের তার গুছিয়ে অন্য দিকে চলে গেলেন। আমরা সারি ভেঙ্গে আন্দোলনরতদের সাথে মিশে গেলাম। স্লোগানে গলা মেলানো শুরু করলাম।

এখন মাইকে ছন্দ বলা হচ্ছে। কিছু ছন্দ গানের সুরে গাওয়া হচ্ছে। আমরা সবাই ছন্দের তালে গানের সুর মেলাচ্ছি। হাতের তালি আর ছন্দ সুরে আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে থাকছে। এই ছন্দ মিলিয়ে গান গাইছে আমার হাবাগোবা দোস্ত ইয়াকুব। আমার চরম রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলনের মূল অংশে স্লোগান দিতে গেছে সে। এই ছেলের সাথে যাদের সামান্যতম পরিচয় আছে- তারা সবাই একে 'বেকুব' বলে ডাকে। আমি অবশ্য কোনদিন বেকুব বলিনি। 'দোস্ত', বলে ডাকি। 'বেকুব দোস্ত' বলে ডাকার খুব ইচ্ছা হয়। কিন্তু হয়ে উঠে না। রুমমেট বলে হয়তো হয় না। একসাথে বেশি থাকা হয় বলে হয়তো এরকম সম্বোধন ভেতর থেকে আসে না। বন্ধুত্বটা মনে হয় একটু বেশিই গাঢ়। বেশি বেশি কোন কিছু ভালো না। আমাদের বন্ধুত্ব প্রায় একপক্ষীয়। গাড়ত্ব-অগাড়ত্ব সব ইয়াকুবের উপর। আমার থেকে ওর উপর যা অনুভূতি তার সবটুকু সহানুভূতি। হয়তো ওর সরলতার জন্য, নয়তো বন্ধুত্বের জন্য।

যাই হোক, এই বেকুবের চট করে ছন্দ তৈরীর এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। যে কোন মূহুর্তে পরিস্থিতি অনুযায়ি ছন্দ মিলিয়ে কথা বলতে পারে।  বিভিন্ন ছন্দ গানের সাথে মিলিয়ে সুর করে গাইতেও পারে। ও ক্লাশ ফাইভের দুই জমজ বোনকে প্রাইভেট পড়ায়। একজনের নাম আঁখি আরেকজনের নাম সাখি। একদিন ওর সাথে টিউশনি ঠিক করতে গেলাম। ও বলল, তিনটা বেজে গেছে। চল, ওদের পড়িয়ে তারপর তোর টিউশনি খুঁজতে যাব। আমার অনেকগুলো খোঁজ আছে, টিউশনি পেয়ে গেলি বলে। আমি ওর সাথে বকবক শুনতে গেলাম। পড়ানোর ফাঁকে নানা ছন্দ মিলিয়ে মেয়ে দু'টার সাথে বেশ মজা করছে ইয়াকুব।

পড়ানোর মাঝে এক সময় কী যেন লিখতে দিল দুজনকে। মেয়ে দুটো লিখা বাদ দিয়ে উদাস মনে বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। ইয়াকুব ছন্দ মিলিয়ে বলল,

বাইরে হচ্ছে বৃষ্টি

দিচ্ছ তোমরা দৃষ্টি,

আমি কিন্তু ঠিকই দেখছি

খাতায় কী করছ সৃষ্টি।

মেয়েদুটো চট করে লেখায় মন দিল। ইয়াকুব আবার ছন্দ মিলিয়ে বলল,

আঁখি আর সাখি,

পড়াশোনায় দিও না ফাঁকি,

দিলে ফাঁকি পড়াশোনায়

বিয়ে দিব দেখাশোনায়।

মেয়ে দুটো হেসে কুটিকুটি।

 

কয়েকজন ছেলেপুলে গিটার, তবলা, বাঁশি, ইত্যাদি সখের সব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এসেছে। আনাড়ি হাতে বেসুরে বাজনা বাজছে। তবে ইয়াকুবের কণ্ঠ এই বেসুরে বাজনার সাথে ভাল মিলছে। গানের সুরের প্রতি স্লোগান শেষে তবলার উপর হালকা করে আঘাত করা হচ্ছে। স্লোগানের শেষটা তবলার আঘাতে সমাপ্ত হচ্ছে। ভালোই শ্রুতি মধুর শোনাচ্ছে।

‘সাধের শিক্ষা বানাইলো মোরে বৈরাগী,

এখন আমি বসে বাজাই ডুগডুগি’।

 

‘ওরে ওরে হাওয়া থাম না রে,

শিক্ষা তো আমারে আর চায় না রে...

এখন আমি যেতে চাই তোর সাথে...’

এ সময় হঠাৎ করে হালকা বাতাসও বয়ে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে আছি ভিসি স্যারের বাড়ির সামনে দিয়ে প্রশাসনিক ভবনের দিকে আসা প্যারিস রোডের একেবারে শেষ প্রান্তে। আমার পিছনে সিনেট ভবন। ডানপাশে জোহা স্যারের কবরকে ঘিরে গোলাকার ফুলের বাগান। এটি প্রশাসনিক ভবনের একদম সামনে। এখানে মেইন গেট থেকে আসা দুটি রাস্তার একটি প্যারিস রোডের সাথে মিলে গেছে আর আরেকটি ডানদিকে মোড় নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এর সামনে দিয়ে চলে গেছে শহীদ মিনারের দিকে। দুপুর প্রায় হয়ে এসেছে। ২টা বেজে গেলে ডাইনিংয়ে খাবার পাওয়া মুশকিল। আমি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ের পথে হাটা দিলাম। ইয়াকুবও ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

রাত ১১টা। প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। দুপুরের পর ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের মারামারি হয়েছে শুনলাম। লাঠি, রাবার বুলেট-পুলিশের অস্ত্র। আর পোলাপানদের অস্ত্র- হলের ডাইনিংয়ের রান্নার খড়ি, রাস্তার ইট-পাটকেল।

এই মারামারি ক্যাম্পাসে একদম সাধারণ ব্যাপার। একটু ভয়ংকর হলে ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। ছেলেদের হল ৮টা আর মেয়েদের হল ১২টার মধ্যে খালি করার নির্দেশ। এত কথা না পেঁচিয়ে সরাসরি বললেই হয়- ছুটি। বাড়ি গিয়ে যেন বলতে পারি ছুটি হইচে, বাড়ি আইচি। আর এরকম হলে বলতে হয়- মারামারি করে এসেছি। কথাটা বলতেও খারাপ লাগে, শুনতেও খারাপ লাগে। বাপ-মা ভাবে যে, কী জংলী হয়ে গেল ছেলেটা! লেখাপড়া করতে ভার্সিটি পাঠালাম, আর বাড়ি এসে বলছে মারপিট করে আসলাম।

বিকেলে হালকা ঘুম দিয়ে সন্ধ্যায় টিউশনিতে ছিলাম। ক্যাম্পাসের তেমন কোন খবর জানি না এখনো। শুধু মারামারি হইছে, এইটুকু শুনেছি। টিভি রুমে গেলাম খবর দেখার জন্য। পোলাপান পাক-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত। চ্যানেল পাল্টানোর কোন সুযোগ নেই। আমি খবর দেখার আশা ছেড়ে রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ইয়াকুব খেলা দেখে রাতে ফিরবে। ওর জন্য দরজা খুলে রাখলাম। এর কাছে দরজা খুলে ঘুমিয়ে কোন লাভ নেই। লাগিয়ে ঘুমালে তো হাঁকডাক করবেই আর খুলে ঘুমালেও এসে অনর্থক চিল্লাপাল্লা করে ঘুম ভাঙ্গাবে।

চলবে...

অতৃপ্তি (পর্ব ৬)

 মোমিন।

জি ছার।

আজ কোন কাজ নেই। কিছু করবোও না। এখন ঘন্টা দুয়েক মুভি দেখবো। তুই ও দেখবি আমার সাথে। হলিউডের মুভি দেখেছিস?

হলিউড কী ছার?

ইংলিশ মুভি। আমেরিকান। তোর তো একশন দেখতে ভালোলাগে। আয় দেখ। মানুষ কাটা একটা মুভি আছে। ভয়ঙ্কর। এক শয়তান লোক শুধু নানা রকম ভয়ানক পদ্ধতিতে মানুষ হত্যা করে। এরকম এক সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি মুভি।

কন কী, কেমুন পদ্ধতি ছার?

সায়েন্স ফিকশন কেমন লাগে তোর? বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী টাইপ।

বিজ্ঞান-ফিজ্ঞান ভাল্লাগে না ছার। শালারা কয়, পানির নাকি স্বাদ-গন্দ নাই। আমি কই, তেষ্টা পাইছে তোর? পানির মুতো সোয়াদের জিনিস এ জগতে আর কী আচে? এমন কোন জীব আছে যে পানি খায় না? পুরা দুনিয়াতো স্বাদহীনের পিচে ছুটছে তাইলে। মানুষ মারারডা কন। ওইডাই শুনি।

আচ্ছা শোন। ধর, খুনি একটা মানুষের মাথার উপর বিশাল এক পাথর ঝুলিয়ে দিলো। আর ওই পাথর বাঁধা দড়ি হুইলের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে ওর হাতে ধরিয়ে দিল। মানুষটা পাথরের নিচে বাঁধা আছে। ও যতক্ষণ দড়িটা টেনে ধরে রাখতে পারবে ততক্ষণই বেঁচে থাকবে। দড়ি ছেড়ে দিলে পাথর এসে মাথায় পড়ে থেঁতলে যাবে। বাঁচার জন্যেও একটা উপায় থাকবে। তবে তা হবে খুবই সাধারণ কিন্তু ভীষণ কঠিন। এরকম আরো কিছু পদ্ধতি ওই লোক ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করে।

যেমন ধর, একটা মানুষকে বেঁধে দিয়ে ওর পেছনে কুড়িটার মত বুলেট ভর্তি বন্দুক তাক করে দিল। আর ওই মানুষটার সামনে একটা বোর্ড আছে যাতে সুইচ আছে মোট বন্দুক থেকে একটা বেশি। যার যে কোন একটি টিপলে সবগুলা বন্দুক থেকে বুলেট শুট হবে। সাথে সাথে লোকটি ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। আর একটা অতিরিক্ত সুইচ আছে যেটি টিপলে বন্দুকগুলো কাজ করবে না। লোকটি বেঁচে যাবে। অর্থাৎ সে বাঁচা-মরার জন্য মাত্র একবার সুইচ টেপার সুযোগ পাবে।

আরেকটা হচ্ছে, ভিকটিমকে ধারালো অস্ত্রের উপরে আনুভূমিক ভাবে শুইয়ে রাখবে। এক্ষেত্রে ভিকটিম অস্ত্র থেকে দশ ফুট উপরে থাকবে। নিচে ছুরি থাকবে ক্রস চিহ্নের আকারে। বাঁধন খুলে দেয়া মাত্র ভিকটিম ছুরির উপরে পড়ে হাত-পা সহ আট ফালি হয়ে কেটে যাবে। তবে এরও একটা বাঁচার উপায় থাকবে।

মুভি শেষে দেখাবে এই লোকটার এমন কুকর্মের পেছনে এক মহৎ উদ্দেশ্য আছে। আয়, মুভি দেখার সময় এরকম আরো সব ভয়ংকর সিস্টেম দেখবি। ভালো লাগবে।

মানুষ মারা দেকতে ভাল লাগবি- ছার?

কেন, সালমান খান ভিলেনদের পেটালে ভালো লাগে না? ভিলেনরা কি মানুষ না? শুধু হিরোরা একাই মানুষ নাকি? আয় বস। ওই চেয়ারটা টেনে বস।

আমি আর ছার খুব মুনোযোগ সহকারে মানুষ মারার ভয়ংকর সব ছিনারি দেখচি। ছার পদ্ধতিগুলি বহুত উপভোগ করচেন। বিশেষ ছিন আসলে আহ, উহ এরকম শব্দ করচেন। খুনির বিভিন্ন ভয়ানক পদ্ধতি ব্যবহারের বিচক্ষণতা দেইখে ছার নানান ভঙ্গিমায় মুগ্ধতা প্রকাশ করচেন। আমাক বইয়ের বিভিন্ন ঘটনা আগে থাকতেই কয়ে দিচ্চেন। এতে আমার বুজতে সুবিদা হচ্চে। বইটা মাজপথে। পুলিশ সেই খুনিক ধরার চেষ্টা চালাচ্চে।

মোমিন।

জি ছার।

সকালে কী প্রশাসনিক ভবনের সামনে দিয়ে এসেছিস?

জি ছার। সব ডিপার্টমেন্টের কেঁচিগেটে তালা ঝুলানা। তয় প্রশাসনিক ভবন খুলা দেকনু। আইজ আর পোলামাইয়ারা আসপিনা। কয়দিন আন্দোলন ক্যরি হাঁপায় গিচে। পুলামাইয়ারা যে বাপ-মায়ের খাইয়ে ইসব ক্যরি বেড়ায় কেন, কে জানে? বদরা পড়ালেখা করতে অ্যাসি মারামারি করে। ঝোপঝাড়ে ব্যসি পেরেম করে। ছি...

কয়টা বাজে, ঘড়ি দেখতো।

সাড়ে নয়টা ছার।

একটু প্রশাসনিক ভবন থেকে ঘুরে আয়। আমি নাস্তা সেরে নেই।

ঘরে কিচু আচে ছার? নাস্তা অ্যানি দিবো?

ফ্রিজে কিছু থাকার কথা। তুই যা, তাড়াতাড়ি যা।

চলবে...

অতৃপ্তি (পর্ব ৫)

 মোমিন, কয়টা বাজেরে?

সুয়া আটটা ছার।

আজ এত সকালে কেন? প্রতিদিন তো সাড়ে নয়টায় আসিস।

আইজ একটু সকাল সকাল আইতে কইচিলেন, ছার।

খেয়েছিস কিছু?

জি ছার। রাইতে কইচি, কাইল ছার আমাক সকাল সকাল যাতি কইচেন। ভোরে ড্যাকি দিও। ছয়টার সুমায় বীথী আমাক আব্বু আব্বু কইরে বিছানা থাইক্কা টাইন্না তুইলে কচ্চে, তুমার খাওয়ার রেডি।

তো এত দেরি করলি কেন?

আপনের ঘুম যদি এত সকালে না ভাঙ্গে। আপনেতো এমনিতেই রাইত কইরে ঘুমান।

আমি উঠেছি কয়টায় জানিস?

না ছার।

ভোর পাঁচটায়। তিনটার সময় ঘুমিয়েছি। সাড়ে চারটা থেকে ভিসি স্যার তিনবার ফোন দিয়েছেন। টের পাইনি। পাঁচটায় জাগা পেয়েছি।

টেলিফোনের শব্দে?

না, একটা দুঃস্বপ্ন দেখে। দেখলাম যুথি আমাকে ঢাকা থেকে ফোন করেছে। বলছে তুমি জমজ বাচ্চার বাবা হয়েছো। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। দুটোই এক রকম। প্যান্ট পরিয়ে দিলে কোনটা ছেলে আর কোনটা মেয়ে তোমার বোঝার সাধ্য নেই। আমি কিন্তু বুঝতে পারছি, হি হি হি। একটা বিষয় লক্ষ করলে তুমিও বুঝে যাবা। আর ভুল হবে না। ছেলেটার দুপায়ের মধ্যে একটা...

হা হা হা, ইতো ভালো স্বপন ছার। দুঃস্বপন কন কেন?

আরে ঘটনাতো এখানেই শেষ না। আমি খবর শুনে ঢাকায় চলে গেছি। হসপিটালে গিয়ে সবার সামনে আমার দুই সন্তানকে ছুরি দিয়ে কেটে টুকরা টুকরা করে ওদের মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।

কন কী, ছার?

জানিস, তখন আমার একটুও খারাপ লাগেনি। হাসতে হাসতে কেটেছি। হাতভর্তি গরম রক্ত।

একুন খারাপ লাগচে না?

না, ওটাতো স্বপ্ন ছিল। সত্য না। খারাপ লাগবে কেন?

জ্ঞানী-গুণী মাইনষের এই একটা ভালা দিক। চট কইরে একটা ভয়ংকর জিনিসকে এড়ি যাতে পারেন। আমরা পারি না। আমাগোর সে ক্ষেমতা নাই।

আচ্ছা মোমিন, তোর কাছে এখন সবচে কঠিন কাজ কী হতে পারে বলতো? ভেবে-চিন্তে বলবি।

ছার, ভাবনা-চিন্তা করতে পারমু না। তয় একুন যেইডা মাতায় আইচে সেইডা হইলো, আমার মাইয়ার চোকে পানি দেকা। খুদার কছম ছার, এরম হইলে আমি...

, বীথীর খবর কী? মেয়েটাকে যে একটা ল্যাপটপ দিলাম। কাজ-টাজ কিছু শিখেছে? নাকি শুধু নাটক সিনেমা দেখে?

জি ছার, মাইয়া তো সারাদিন ল্যাপটপ হাতেই প্যড়ি থাকে। ওরির ল্যাপটপে শারুখ খান আর ছালমান খানের কিচু বই আচে। বাংলা নাটক আচে কিচু। ওই দেকে আর আমাক বুজায়ে দেয়। হিন্দি ভাষা তো পুরাই শিইখে ফালাইচে। খুবই বুদ্ধিমতি মাইয়া ছার।

শুধু নাটক সিনেমা বুঝলেই তো হবে না। কাজ শিখতে হবে। কোন ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করে দিসনি?

জি ছার, কোতি জানি ভর্তি হওয়ার জন্যি তিন হাজার ট্যাকা নিলি। প্রতিদিন বিকালে ল্যাপটপ লিয়ে যায়। আর কী সব নোটপত্র আইনে দেইখে দেইখে কম্পিউটার টিপে। আমি অত সব বুজি না। সেদিন কলাম, মা বড় হয়েচো, এখন দেইখে দেইখে পড়লে চলবে? আমার কতায় কোন পাত্তাই দিল না। কইল, 'আব্বু একটা প্রিন্টার কিনে দাও'। পুনের’শ টেকা দিয়া একটা পিন্টার কিনি দিলেম। সিদিন ওরির জন্মদিনে একটা কাগজে আমার আর ওরির মায়ের নাম যোগ ক্যরি সুমান চিহ্ন দিয়া ওরির নাম লিকে দরজায় টাঙ্গা দিচে।

মোমিন+রোজিনা=বীথী

কী পাগলি মাইয়া!

আচ্ছা, বীথীর কোন ধরনের মুভি বেশি ভাল লাগে জানিস? রোমান্টিক না একশন?

ইসব কী ছার?

প্রেম নাকি মারামারি?

দুইটাই ছার। কলাম না, ছালমান আর শারুখ ওরির পচন্দের নায়ক। আমাকও ওগোর ভক্ত কইরে ফালাইচে। তয়, ও মাইয়া তো, শারুখ খানের উপর একটু বেশি দূর্বল। আমার আবার ছালমান খানকে অচাম লাগে। যেমুন চিহারা, তেমুন বডি, মারপিট সুমান হারে।

আমার ল্যাপটপটা চালু করতো। একটু কাজ করতে হবে। ও হ্যাঁ, যুথিকে আগে ফোন লাগা। আমি একবার দিয়েছিলাম, রিসিভ করল না। মনে হয় ঘুমিয়ে আছে। এখন একবার ট্রাই করে দেখতো। উঠল নাকি।

 

আমি মোমিন। একরামুল ছারের বাড়িত কাম করি। ছার অসাধারণ একজন মানুষ। তার পুরা নাম প্রফেসর ড. এস. এম. একরামুল হাসান। ড. মানে বুজি। ডাক্তার। এস. মানে বুজি না। এম. মানেও বুজি না। ভারী কোন ডিগ্রি-ফিগ্রি হবি হয়তো। ইসব মানুষের তো ডিগ্রির অভাব নাই। নামের আগের অক্ষরের পরে ফুটা থাকার মানেই ডিগ্রি। তয় ছারের নামের আগে খুব বেশি ফুটা নাই। ছারের মুনে হয় ডিগ্রি কম। এই ডিগ্রি গুলির নাম কী ছারকে জিজ্ঞাস করতে হবি। সাউস পাই না। যদি জিজ্ঞাস করি, আর ছারের ডিগ্রি যদি কম হয় তাহালে মন খারাপ করবেন বা কড়া ক্যরি ধুমুক দিয়া কবেন, হারামজাদা ইসবের মানে বুজিস না? মূর্খ লোকদের তো এই একটা সমস্যা, বড় মানুষদের কদর বুজে না। আমার কিন্তু নামের মদ্দ্যে ফুটা দেকলে পিলে চ্যমকি যায়। সুম্মান করার জন্যি মাতা নুইয়া আসে। তয় ছারের ড. এর ব্যাপারটা আমি মিলাতে পারিনে। উনিতো ডাক্তারি করেন না। তাছাড়া সব ছারের নামের আগেই ড. আচে। ওনারা সবাই ডাক্তার নাকি তাও জানিনে। ডাক্তার হলে মেডিকেলে থাকপে। একেনে কেন? সিদিন বীথী কইল, 'জানো আব্বু! একরামুল স্যার আমাকে বললেন তার পুরো নাম বলতে। জানি কিনা তাই। আমি বললাম, মোঃ একরামুল হাসান। স্যার কী মাইন্ড করলেন, জানো আব্বু? বললেন, এভাবে বলবে না বীথী, বলবে 'ড. এস. এম. একরামুল হাসান'

ছারকে সাউস ক্যরি জিজ্ঞাস করলে বকাঝকা ক্যরি হয়তো বুজায়ে দিবেন। তখন দেকা যাবি ব্যাপারটা নিতান্তই সুজা কিচু।

ছারের বউ, মানে ম্যাডাম খুব রাগী টাইপ মানুষ। হ্যাবি গম্ভীর। তিনি আমাক ল্যাপটপ চালু করা শিখাইচেন। একদম সুজা। খালি এই সুইচটাত টিপ দিতে হবি। আর হিন্দি বই দেকা শিখাইচে, বীথী।

ছার অতি বাচাল একটা লোক। তারপরেও ছার আর ম্যাডামের মদ্দ্যে অসম্ভব মিল দেকি। বউ গম্ভীর হওয়ার সুবিদাটা ছার ভোগ করচেন। ঝগড়াঝাটি কম হয়। মুনে শান্তি থাকে। আমার মুনে শান্তির বালাই নাই। বীথীর মায়ের সাতে কুনোদিনই কতায় পারি না।

ছার ম্যাডামের সাতে কতা কচ্চেন। ছার শুদু হুঁ, হ্যাঁ, , ইয়েচ, ওকে ক্যরি যাচ্চেন একনাগাড়ে। ম্যাডামের কোন কতা আমি শুনতে পেলুম না। একরামুল ছার কতা শেষ কইরে আইলেন।

চলবে...